নহিরুদ্দিনের ইতিকথা হৃদয়ে রয়েছে গাঁথা

19th September 2021 5:04 pm #প্রবন্ধ_নিবন্ধ_ফিচার
নহিরুদ্দিনের ইতিকথা হৃদয়ে রয়েছে গাঁথা


নহিরুদ্দিনের ইতিকথা হৃদয়ে রয়েছে গাঁথা

জৈদুল সেখ, কান্দি 

প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের শক্তিপুর থানার প্রসাদপুর গ্রাম। ভাগীরথী নদীর পূর্ব পাড়ে প্রকৃতির কোলে সেখানেই  বসে গান বাঁধেন কবিয়াল নহিরুদ্দিন সেখ। মাটির মানুষের মাটির সুর ছড়িয়ে পড়ে নদীর জলের কলকল শব্দের ভেতর দিয়ে। বয়ে চলে নদীর জলের মতো আকাশে বাতাসে। 

পেশা নয়, নেশার টানে কবি গানের জগতে একসময় পা রেখেছিলেন নহিরুদ্দিন। বয়স তখন ছিল কম। গ্রামে প্রায়শ হতো কবিগানের আসর। সেই আসরে রাতভোর গানের লড়াই দেখতে দেখতে কোনও মায়ার জগতে চলে যেতেন তিনি। তিনি বলেন, কবিয়ালদের গানের মাধ্যমে লড়াই কে খুব  উপভোগ করতাম। গান শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে যেতো। বাড়ি এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কল্পনায় অন্য দলকে শায়েস্তা করতে গানের লড়াইয়ে মেতে থাকতাম। দর্শকদের চিৎকার, হাততালি সবই যেন শুনতে পেতাম। তারপরই আর বসে থাকতে পারিনি। অদ্ভুত এক নেশায় ক্রমশ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। 

সেই সময়ে নহিরুদ্দিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন ভাগীরথী নদীর ধারে অনন্ত প্রকৃতির মাঝে। তিনি জানান,ওখানে ছিল আদি অনন্ত মুক্তির স্বাদ। নদীর জলের আওয়াজ, বিকেলের আলো নিভে এলে মাথার ওপর দিয়ে বাসায় উড়ে যেত হরেক পাখিদের দল। তাদের ডাকের মধ্যেও এক মাদকতা ছিল। আমার গান বাঁধতে গিয়ে সেসব মনের মধ্যে থাকতো। আমরা সুর করে গান ধরতাম। পরে গানের নেশার টানেই বন্ধু সহকারি বিরিঞ্চি ঘোষের সখ্যতায় গুরু অনাদি মন্ডলের কাছে যাওয়া। এবং গানের পাঠ নেওয়ার শুরু। ক্রমেই গুরু-শিষ্য বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়। নহিরুদ্দিনের কথায়, 

এরই মাঝে ভালবাসা কবি মনে একটু নেশা/ মেলামেশা এক বন্ধুর সনে/ সে বন্ধু বিরিঞ্চি ঘোষ/।ছিল তার একটু দোষ,/ ছিল না তার মনে /একটুও আক্রোশ /একদিন বন্ধু সাথে করে / নিয়ে গেল গুরুর বাড়ি/হাতে খড়ি সেদিন আমার /কবির গুরু অনাদি মন্ডল / চলার পথে সহায়-সম্বল” ।"

একসময়ে গ্রামে গ্রামে রাত জেগে পালা করে মানুষের মন জয় করা নহিরুদ্দিন বর্তমানে বৃদ্ধ। কিন্তু তাঁর কাজ থেমে নেই। আজও প্রকৃতির কোলে বসে তাঁর গানের আসর। নিত্য সৃষ্টি করে চলেছেন নতুন গান। গ্রামেরই কিছু মানুষকে নিয়ে গড়া তাঁর দলের চলে রেওয়াজ। এ সবের মধ্যেও কোথাও যেন অর্থনৈতিক অবস্থা সুর কেটে দেয়। তিনি বলেন, আমাদের লোকশিল্পীদের অবস্থা খুব খারাপ। সেই সময়ও হারিয়ে গেছে। মাঝে লকডাউন ও করোনা পরিস্থিতি সঙ্কটজনক অবস্থায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবু বর্তমান সরকার শিল্পীদের নিয়ে ভাবছেন, সেটা বড় পাওনা। সরকারের প্রতি আস্থা রেখে গেয়ে ওঠেন কবিয়াল, 

"সরকারের যা নিয়মনীতি প্রচারে আছি বাধ্য/ ভেবে নহিরুদ্দিন কয় শেষ সম্ভল সহায়/ সরকারের সাহচর্য ঠিক পাব নিশ্চয়,/নিশ্চিত মোদের হবে যে জয় ত্রান পাব যথাসাধ্য” ।





Others News

দুবাইয়ে ‘ভূতের গ্রাম’

দুবাইয়ে  ‘ভূতের গ্রাম’


সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘ভূতের গ্রাম’ নামে পরিচিত একটি এলাকা আছে, পরিত্যক্ত ওই এলাকার নাম আল জাজিরাহ আল হামরা। সেখানে সমুদ্র নিকটবর্তী একটি দ্বীপ ৫৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় জনমানবশূন্য ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

আমিরাতের রাস আল খাইমাহ প্রদেশে অবস্থিত এ দ্বীপটিকে স্থানীয় লোকজন ‘ভূতের গ্রাম’ হিসেবেই চেনেন। বাংলায় অনেকে ‘লাল দ্বীপ’ বলেন। এখানকার বহু বছরের পুরনো ঘরবাড়ি আর ধ্বংসস্তুপগুলোতে মিশে আছে রহস্যময় নানা ঘটনা আর গল্প।

স্থানীয় লোকজনের সূত্রে জানা যায়, চৌদ্দশ শতাব্দীতে গ্রামটির উদ্ভব। ১৮৩১ সালে এর পুনঃনির্মাণও হয়। ব্রিটিশ তথ্য অনুযায়ী গ্রামে প্রায় তিনশ ঘরে চার হাজার একশর মতো লোক বসবাস করত। সেখানে ছিল ১৩টি মসজিদ। রাস আল খাইমাহ শহরের দক্ষিণের গ্রামটি একসময় বণিকদের পদচারণায় মুখরিত ছিল। 

১৯৬০ সালে গ্রামটি বেশ সমৃদ্ধ ছিল। তখন অনেক বিলাসী বাড়িঘর ছিল। উপকূলীয় গ্রামটিতে তখন ফার্সি অভিবাসী, পর্তুগিজ ব্যবসায়ী এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তারা দাপিয়ে বেড়াত। কারণ, এখানকার স্থানীয়রা মাছ এবং মুক্তার ব্যবসা করত। 
কিন্তু হঠাৎ করেই দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে। একপর্যায়ে এই গ্রামে জ্বিন-ভূতের বসবাসের খবর রটে যায়। বাসিন্দাদের মনে ভয়-ভীতি তৈরি হয়। এর কয়েক বছর পর দ্বীপটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে প্রায় ২ হাজার ৫০০ বাসিন্দা আবুধাবি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৬৮ সালের পর হঠাৎ করেই মানুষশূন্য হতে থাকে দ্বীপটি।
যারা থেকে যায় তারাও খুব ভয়ে দিন কাটায়। কারণ, এখানে অশরীরী আত্মার আনাগোনা বেড়ে যায় বলে স্থানীয়দের ধারণা। নানা রকম ভৌতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিদিন জমতে থাকে নানা গল্প। স্থানীয়দের মতে, জ্বিন-ভূতের ভয়ে লাল দ্বীপকে ১৯৬৮ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে দ্বীপের বাসিন্দারা সবাই আবুধাবি পাড়ি দেন। সেখানেই তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তবে এখনও এ দ্বীপে কোনো কোনো মালিক নিজের ঘরবাড়ি দেখতে যান।

আল জাজিরা আল হামরা এলাকাটি প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটিসের জন্য জনপ্রিয়। প্রায়ই পর্যটক ঘুরতে যান। প্রাচীন দুর্গের ছবি তুলতে গেলে তাদের সঙ্গেও ঘটতে থাকে অস্বাভাবিক ঘটনা। স্থানীয়দের ধারণা, এখানে অভিশপ্ত আত্মা রয়েছে। তারা প্রায়ই বিচিত্র হাতের ছাপ দেখতে পান। তাদের ধারণা, এটি আগত দর্শনার্থীদের জন্য সতর্ক সংকেত। যদিও স্থানীয়রা তাদের বরাবরের মতোই নিরুৎসাহিত করে। তারা সতর্ক করে দেন যে, এখানে দুষ্ট জিনের উপদ্রব বেশি। বিজ্ঞানের যুগে এসবের ব্যাখ্যা চলে না। তবুও নিত্যনতুন ভৌতিক রহস্য আর নিঃস্ব হওয়া গ্রামটিকে কি অস্বীকার করা যায়!

স্থানীয়দের তথ্য মতে, আরব আমিরাতের প্রাদেশিক শহর রাস আল খাইমাহ থেকে রহস্যময় এ দ্বীপটির দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। একসময় এ দ্বীপের বাসিন্দারা নৌকা নিয়ে গভীর সমুদ্র থেকে মুক্তা সংগ্রহ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে বর্তমানে এ দ্বীপে যতটুকু চোখ যায় কেবলই ধ্বংসস্তুপ, ভাঙা ভবনের দৃশ্য দেখা যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন ইটপাথরে ভরা জঞ্জালময় এক ভৌতিক পরিবেশও মনের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

 

এক কিলোমিটারেরও কম আয়তনের ভৌতিক গ্রামটিকে বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসন তারকাঁটার প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছে। ভাঙা ভবনগুলোর পথ ধরে ভেতরে যেতে গা ছমছম করে ওঠে। বড় বড় সামুদ্রিক পাথরে নির্মিত শত শত ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। লোকজন নেই বললেই চলে। চলাচলের রাস্তাগুলো নানা জঞ্জালে ভরা। তবে উপরের পলেস্তারা খসে গেলেও পুরনো মসজিদটি অনেকটা অক্ষত রয়েছে। আবার কয়েকটি ঘর মেরামত করে বর্তমানে কিছু মৎসজীবী শ্রমিক বাস করছেন।


শ্রমিকরা জানান, স্থানীয়দের মধ্যে লাল দ্বীপে জ্বিন-ভূত থাকার প্রচার-প্রচারণা রয়েছে। পরিত্যক্ত গ্রামের ঘরবাড়িগুলো বেশিরভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। তারকাঁটার প্রাচীরের কাছাকাছি কয়েকটি ঘর মেরামত করে তারা কমমূল্যের ভাড়া পরিশোধ করে থাকেন। তবে ঘরগুলোর মালিকের বংশধররা এখনও এসে খোঁজ-খবর করেন।
এর আগে গ্রামটি নিয়ে ভৌতিক চলচ্চিত্র নির্মাণেরও উদ্যোগ নেন কয়েকজন নির্মাতা। একবার স্থানীয় চলচ্চিত্রনির্মাতা ফয়সাল হাশমি কিছু বন্ধুকে নিয়ে গ্রামটিতে একটি রাত কাটাতে আসেন। তখন তাদের সঙ্গে নাকি ঘটতে থাকে নানা ভৌতিক কর্মকাণ্ড। বোঝার বাকি রইল না যে গ্রামটি ‘ভয়ঙ্কর ও অভিশপ্ত’।

চলচ্চিত্র নির্মাতা ফয়সাল হাশমি বলেন, এ গ্রামে যারা ছিলেন কিংবা ভ্রমণে এসেছেন তাদের সঙ্গে একবার হলেও রহস্যময় ভূতুড়ে কোনো না কোনো ঘটনা ঘটেছে। কিছু কিছু মানুষ এ গ্রামে জ্বিন নেই বললেও বেশিরভাগ স্থানীয় এখানে জ্বিনের অস্তিত্ব আছে বলে দাবি করেন